সাবেক সংসদ সদস্য ও হিন্দু সিংহপুরুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Sanatan Patra
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

আজ এই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠ, সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। দিবসটি উপলক্ষে তাঁর নির্বাচনী এলাকা সুনামগঞ্জসহ রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, দোয়া ও প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সংসদীয় রাজনীতির একজন দৃঢ় ও স্পষ্টভাষী নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শুধু একজন দক্ষ সংসদ সদস্য হিসেবেই নয়, বরং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের পক্ষে অবিচল অবস্থান নেওয়া একজন সংগ্রামী রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বক্তব্য ও ভূমিকা বহুবার সংসদ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম ১৯৪৬ সালে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার আলমপুর গ্রামে। একটি শিক্ষিত হিন্দু পরিবারে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিকের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে খুব অল্প বয়সেই। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সচেতন ও সক্রিয় ছিলেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারার পরিপক্বতা শুরু হয়।

আইনের প্রতি গভীর আগ্রহ থেকেই তিনি পরবর্তীতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। আইন অঙ্গনে তাঁর দক্ষতা ও যুক্তিনিষ্ঠতা খুব দ্রুত পরিচিতি পায়। এই আইনগত জ্ঞানই পরবর্তীতে তাঁকে সংসদীয় রাজনীতিতে একটি বিশেষ অবস্থানে নিয়ে যায়। সংসদে তাঁর বক্তব্যে সংবিধান, আইন ও বিধিবিধানের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বরাবরই গুরুত্ব পেত।

ছাত্রজীবন থেকেই বামধারা ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি মৌলিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সংসদীয় রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখেন। তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় সুনামগঞ্জ-২ আসনের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনী এলাকায় তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা ও উন্নয়নমূলক ভূমিকা এলাকাবাসীর কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে।

সংসদে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, তীব্র বিতর্ক এবং আইনগত বিশ্লেষণ। বাজেট, আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তিনি নিয়মিত বক্তব্য রাখতেন। তাঁর বক্তব্য অনেক সময় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র আলোচনা সৃষ্টি করলেও সংসদীয় কার্যক্রমে তা একটি আলাদা গতি এনে দিত বলে বিশ্লেষকদের মত।

হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন দৃশ্যমান নেতা হিসেবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, সম্পত্তি দখল কিংবা বৈষম্যের অভিযোগ উঠলে তিনি সংসদে ও রাজনৈতিক মঞ্চে বিষয়গুলো তুলে ধরতেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইনের শাসনের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধানের পক্ষে তিনি যুক্তি দিতেন।

তিনি বারবার বলেছেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এই অবস্থান তাঁকে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা নয়, একজন জাতীয় রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত করেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে তিনি আপসহীন ছিলেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক জীবন বিতর্কহীন ছিল না। তাঁর কিছু বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে আক্রমণ করেছেন। তবে সমর্থকদের মতে, এসব বিতর্কের মধ্যেও তিনি তাঁর আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে যাননি। সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি সব সময় যুক্তি ও আইনের ভিত্তিতে কথা বলার চেষ্টা করেছেন।

সংসদের বাইরে তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল বক্তা ও লেখক। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রবন্ধ ও মতামত লিখে তিনি সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর লেখালেখিতে গণতন্ত্র, সংবিধান, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক নৈতিকতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেত। এসব লেখা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং তরুণদের জন্য একটি বৌদ্ধিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে বলে অনেকের অভিমত।

ব্যক্তিজীবনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সহজ-সরল ও পরিবারকেন্দ্রিক। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি পড়াশোনা ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি একজন রসবোধসম্পন্ন ও তর্কপ্রিয় মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যিনি যুক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। তখন অনেক রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষক মন্তব্য করেছিলেন, আইন ও সংবিধান বিষয়ে এত গভীর জ্ঞানসম্পন্ন রাজনীতিক সংসদে খুব কমই দেখা যায়।

মৃত্যুর নয় বছর পরও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম ও ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসে। সংসদীয় গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু অধিকার কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান এখনও উদ্ধৃত হয় বিভিন্ন আলোচনায়। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর মতো অভিজ্ঞ ও স্পষ্টভাষী রাজনীতিকের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে নানা স্মৃতিচারণ। রাজনৈতিক সহকর্মী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। এসব স্মৃতিচারণে উঠে আসছে তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, আইনগত দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার কথা।

স্মরণ কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শুধু একজন সংসদ সদস্য ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংসদীয় সংস্কৃতি ও যুক্তিনির্ভর রাজনীতির একটি প্রতীক। তাঁর আদর্শ ও রাজনৈতিক চর্চা নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।

সাবেক সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও অবদানের কথা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম একজন সাহসী, প্রজ্ঞাবান ও স্পষ্টভাষী রাজনীতিক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

...

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Out
Ok, Go it!
To Top